ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বদলে কি লড়বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত মানবাকৃতির রোবট? এমন প্রশ্নই এখন আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নতুন উদ্যোগকে ঘিরে।
সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ফাউন্ডেশন রোবোটিকস এমন একটি মানবাকৃতির রোবট তৈরি করছে, যার নাম ‘ফ্যান্টম’। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি সামরিক ও বেসামরিক- উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি মোতায়েন করাও তাদের লক্ষ্য।
বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা ‘ফ্যান্টম’ রোবটকে বিভিন্ন মৌলিক কাজ শেখানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, বস্তু সরানো, সরঞ্জাম বহন এবং ভবনের ভেতরে অনুসন্ধান চালানোর মতো কাজ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সানকেত পাঠক বলেন, ভবিষ্যতে এসব রোবট বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ করে অস্ত্রধারী বাহিনীকে সহায়তা করতে পারবে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি হুমকি মোকাবিলার কাজও করতে সক্ষম হবে।
তার মতে, রোবট ব্যবহার করলে সেনাদের ঝুঁকি কমবে এবং অভিযানে বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও কমানো সম্ভব হবে।
বর্তমান ‘ফ্যান্টম এমকে-১’ মডেলের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি এখনও ব্যাটারিচালিত নয়, পড়ে গেলে নিজে উঠে দাঁড়াতে পারে না এবং এর হাতের সক্ষমতাও সীমিত। তবে উন্নত সংস্করণ ‘এমকে-২’-এ দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি, অধিক শক্তিশালী হাত এবং অস্ত্র ব্যবহারের উপযোগী কবজি সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফাউন্ডেশন রোবোটিকসের দাবি, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তারা বছরে অন্তত ৪০ হাজার রোবট উৎপাদন করতে চায়। দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন খরচ ২০ হাজার ডলারের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও রয়েছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের গবেষণা চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ইউক্রেনের সেনাবাহিনীও পরীক্ষামূলকভাবে তাদের দুটি রোবট ব্যবহার করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, মানবাকৃতির রোবটকে কার্যকর যুদ্ধযন্ত্রে পরিণত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চিত পরিবেশ, দুর্গম ভূখণ্ড এবং দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বর্তমান প্রযুক্তির জন্য সহজ নয়।
রোবোটিকস বিশেষজ্ঞ ডিন ফানখাউজারের মতে, আজকের অনেক বাণিজ্যিক মানবাকৃতির রোবট এখনও গুদামজাতকরণের সাধারণ কাজেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে এসব রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকরভাবে লড়াই করতে দেখা যাবে- এমন ধারণা কিছুটা অতিরঞ্জিত।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র যুদ্ধের নৈতিক সীমা আরও দুর্বল করে দিতে পারে এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে জটিল করে তুলতে পারে।
তবুও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিকস প্রযুক্তিতে আধিপত্যের লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে মানবাকৃতির রোবটের উপস্থিতি বাস্তবে পরিণত হতে পারে। তবে মানুষকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার মতো সক্ষমতা অর্জনে এখনও অনেক পথ বাকি।
