যারিন নুজহাত রোযা
একসময় যেখানে শোনা যেত শেয়ালের ডাক, আজ সেখানে ছুটে চলে বিলাসবহুল গাড়ি। যে জনপদ ছিল কৃষক আর সাধারণ মানুষের বসতি, সময়ের স্রোতে সেটিই হয়ে উঠেছে ঢাকার অভিজাত গুলশান। কিন্তু ঝলমলে এই নগরীর নিচে চাপা পড়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প।
ঢাকার গুলশান নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঝকঝকে সড়ক, সুউচ্চ ভবন, দামি গাড়ি, অভিজাত রেস্তোরাঁ আর সারি সারি বিদেশি দূতাবাস। রাজধানীর সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ঠিকানাগুলোর একটি এটি।
কিন্তু আজকের এই ব্যস্ত নগরী একসময় ছিল একেবারেই অন্যরকম।
ছিল না আকাশছোঁয়া ভবন, ছিল না বিলাসবহুল গাড়ির বহর, ছিল না ঝলমলে শপিংমল কিংবা অভিজাত রেস্তোরাঁ। ছিল সবুজে ঘেরা নিরিবিলি এক গ্রাম। নাম ভোলা গ্রাম।
যেখানে রাত নামত শেয়ালের ডাকে
গত শতকের মাঝামাঝি সময়েও ভোলা গ্রাম ছিল মূল ঢাকার অনেকটাই বাইরে। চারপাশে ছিল গাছপালা, ঝোপঝাড়, পুকুর আর কৃষিজমি। জনবসতিও ছিল অল্প।
সূর্য ডোবার পর নেমে আসত নীরবতা। রাতের অন্ধকারে ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসত শেয়ালের ডাক। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ষাটের দশকের শুরুর দিকেও আশপাশের বনে মেছোবাঘের দেখা মিলত।
আজ যেখানে কোটি কোটি টাকার জমি, একসময় সেখানেই ছিল কৃষকের খেত। এই গ্রামের সঙ্গে ভোলার যোগসূত্রও ছিল বাস্তব। এখানকার কৃষিকাজে যুক্ত মানুষের বড় একটি অংশ এসেছিলেন ভোলা দ্বীপ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের বসতির পরিচয়ই হয়ে যায় ভোলা গ্রাম। কিন্তু সময় যে এই গ্রামের জন্য অন্য এক গল্প লিখে রেখেছিল, তা তখন কেউ জানত না।
ভোলা থেকে গুলশান
ষাটের দশকে বদলে যেতে শুরু করে পুরো দৃশ্যপট। ঢাকার ধনী ও অভিজাত মানুষেরা তখন শহরের কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি আবাসিক এলাকার সন্ধানে। তাদের নজর পড়ে ভোলা গ্রামের ওপর।
তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট-ডিআইটি এলাকাটিকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। আর তখনই সামনে আসে একটি প্রশ্ন- নতুন এই অভিজাত এলাকার নাম কী হবে?
‘ভোলা গ্রাম’ নামটি যেন নতুন স্বপ্নের সঙ্গে মানানসই নয়। শেষ পর্যন্ত নাম নেওয়া হয় পাকিস্তানের করাচির একটি অভিজাত এলাকা থেকে- গুলশান। বাংলায় যার অর্থ ফুলের বাগান।
নাম বদলাল। বদলাতে শুরু করল জনপদের চেহারাও।
হারিয়ে গেল যাদের ভিটেমাটি
গুলশানের উত্থানের গল্প যতটা চকচকে, তার অন্য পিঠ ততটাই বেদনাদায়ক।
পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে ভোলা গ্রামের বহু মানুষের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কৃষিজমি, পুকুর, গাছপালা- ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে সবকিছু। বাস্তুচ্যুত হয় বহু পরিবার।
যে মানুষগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই মাটিতে চাষাবাদ করেছে, তাদের অনেকেই চলে যেতে বাধ্য হন ঢাকার বাইরে। কেউ আশ্রয় নেন গাজীপুরে, কেউ অন্য কোথাও।
কিন্তু নতুন জায়গায় তারা আর আগের মতো গৃহস্থ হতে পারেনি। কেউ ছোট ব্যবসা করেছে, কেউ দিনমজুরি। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকের জীবনও কাটে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
অন্যদিকে, তাদের ফেলে যাওয়া জমির ওপর গড়ে উঠতে থাকে নতুন গুলশান। একটি গ্রামের জায়গা নেয় একটি অভিজাত নগরী।
হাঁটতে হতো মহাখালী থেকে
গুলশানের আজকের অবকাঠামো একদিনে তৈরি হয়নি। শুরুর গুলশানে ছিল না আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, ছিল না পর্যাপ্ত সড়কবাতি, বাজার কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা। এমনকি মহাখালী থেকে গুলশানে যেতে অনেককেই হাঁটতে হতো। ছিল মাত্র কয়েকটি পুরোনো স্থাপনা। এর মধ্যে ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভোলা জামে মসজিদ ছিল উল্লেখযোগ্য।
সময়ের সঙ্গে স্কুলটি বাড্ডায় স্থানান্তরিত হয়েছে। মসজিদটি এখন পরিচিত গুলশান জামে মসজিদ নামে। এই দুটি স্থাপনাই যেন হারিয়ে যাওয়া ভোলা গ্রামের নীরব সাক্ষী।
গুলশান যখন সত্যিই ছিল ‘ফুলের বাগান’
শুরুর গুলশান ছিল আজকের চেয়ে অনেক শান্ত। এক-দোতলা বাড়ি, প্রশস্ত জায়গা, গাছপালা আর সামনে ফুলের বাগান- অভিজাত আবাসিক এলাকার যে স্বপ্ন নিয়ে গুলশানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে নামের অর্থটাও যেন মিলে যেত।
গুলশান লেক ছিল এলাকার অন্যতম আকর্ষণ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিদেশি দূতাবাসগুলোরও পছন্দের ঠিকানা হয়ে ওঠে গুলশান। ধীরে ধীরে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে এই এলাকার।
গুলশান তখন আর শুধু একটি আবাসিক এলাকা নয়, ঢাকার নতুন অভিজাত পরিচয়ের প্রতীক।
তারপর বদলে গেল সব।
আশির দশকের পর গুলশানের চেহারায় আসে বড় পরিবর্তন।
নব্বইয়ের দশক থেকে একতলা-দোতলা বাড়ির জায়গা নিতে শুরু করে বহুতল ভবন। আবাসিক এলাকার পাশাপাশি বাড়তে থাকে বাণিজ্যিক স্থাপনা।
একসময় যে এলাকায় নীরবতা ছিল সৌন্দর্যের অংশ, সেখানে এখন যানজট আর শব্দদূষণ নিত্যদিনের বাস্তবতা।
গুলশান লেকের পাশ দিয়ে ছুটে চলে গাড়ি। একসময়ের গাছপালার জায়গা দখল করেছে কংক্রিট। ছোট ছোট বাড়ির জায়গায় মাথা তুলেছে বিশাল অট্টালিকা।
তবু গুলশান তার গুরুত্ব হারায়নি।
বরং সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি ও অভিজাত জীবনের অন্যতম কেন্দ্র।
গুলশানের নিচে চাপা পড়ে আছে ভোলা
আজ গুলশানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে ভোলা গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। সারি সারি বহুতল ভবন, বিলাসবহুল গাড়ি, রেস্তোরাঁ, অফিস, দূতাবাস- সব মিলিয়ে এটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী।
তবু কোথাও কোথাও অতীত এখনও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।
একটি পুরোনো মসজিদ। একটি স্কুলের স্মৃতি। কিছু পুরোনো নাম। আর ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া একটি গ্রাম- ভোলা।
গুলশানের গল্প তাই শুধু একটি এলাকার আধুনিক হয়ে ওঠার গল্প নয়।
এটি সময়ের গল্প। নগরায়ণের গল্প। মানুষের স্বপ্নের গল্প। আবার উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া মানুষের বেদনার গল্পও।
একসময় এই মাটিতে কৃষক লাঙল চালাতেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরত গরু। রাতে শোনা যেত শেয়ালের ডাক।
আজ সেখানে আলো ঝলমলে নগরী।
ভোলা গ্রাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার বুকের ওপর দাঁড়িয়েই তো জন্ম নিয়েছে আজকের গুলশান।
