হাম (Measles) অনেকেই শুধু জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ির রোগ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এটি শিশুদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, কানের সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কের জটিলতাও হতে পারে।
বাংলাদেশে চলতি বছরে হামে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে কয়েশ’ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হামের সাধারণ লক্ষণ
হামের লক্ষণ সাধারণত কয়েক ধাপে দেখা যায়।
প্রথম দিকে হতে পারে-
- উচ্চ জ্বর
- কাশি
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া
- চোখ দিয়ে পানি পড়া
এর কয়েকদিন পর মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ দেখা দিতে পারে। এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠে, যা সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়।
সন্তানের হাম হলে প্রথমে কী করবেন?
১. শিশুকে বিশ্রামে রাখুন
হাম হলে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যায়। শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দিন। জোর করে খেলাধুলা বা বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
২. প্রচুর তরল খাবার দিন
হামের সময় জ্বর ও ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে পারে।
তাই শিশুকে দিন-
- নিরাপদ পানি
- ওরস্যালাইন
- স্যুপ
- ডাবের পানি
- পাতলা খিচুড়ি
- ফলের রস (অতিরিক্ত চিনি ছাড়া)
শিশু যদি পানি খেতে না চায়, তাহলে অল্প অল্প করে বারবার দিন।
৩. পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান
অনেক শিশুর ক্ষুধা কমে যায়। তবুও যতটা সম্ভব পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
যেমন-
- ডিম
- মাছ
- মুরগির মাংস
- ডাল
- দুধ
- কলা
- পেঁপে
- সবজি
কম খেলে সমস্যা নেই, কিন্তু একেবারে না খেয়ে থাকলে দুর্বলতা বাড়বে।
৪. জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখুন
জ্বর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে।
তবে নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।
৫. চোখের যত্ন নিন
হামের সময় চোখ লাল হওয়া ও আলোতে অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক।
- ঘর খুব উজ্জ্বল না রাখাই ভালো
- পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখের আশপাশ মুছে দিতে পারেন
- চোখে ইচ্ছামতো ড্রপ ব্যবহার করবেন না
শিশুকে আলাদা রাখুন
হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। শিশু কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে যেতে পারে।
তাই বাচ্চার হাম হলে-
- স্কুলে পাঠাবেন না
- আত্মীয়-স্বজনের ভিড় এড়ান
- বিশেষ করে ছোট শিশু ও গর্ভবতী নারীদের কাছ থেকে দূরে রাখুন
ফুসকুড়ি ওঠার পরও কয়েকদিন পর্যন্ত রোগটি অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।
হাম হলে কখন বাচ্চাকে হাসপাতালে নিতে হবে?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নিন-
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- শিশুর ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া
- খিঁচুনি
- অতিরিক্ত ঘুমিয়ে থাকা বা জাগাতে কষ্ট হওয়া
- পানি বা খাবার একেবারেই না খাওয়া
- বারবার বমি
- তীব্র ডায়রিয়া
- জ্বর অনেক দিন ধরে খুব বেশি থাকা
- কানে ব্যথা বা কান দিয়ে পুঁজ বের হওয়া
এসব জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
হাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়
হামের কোন নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা প্রতিরোধের জন্য করা হয়। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হাম প্রতিরোধে শিশুর সব টিকা সময়মতো দেওয়া প্রয়োজন। টিকা নেওয়া শিশুদের হাম হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকে এবং হলেও সাধারণত জটিলতা কম হয়।
মনে রাখুন
হামকে সাধারণ জ্বর-ফুসকুড়ির রোগ ভেবে অবহেলা করবেন না। বেশিরভাগ শিশু সঠিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে শ্বাসকষ্ট, তীব্র দুর্বলতা, খিঁচুনি বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
শিশুকে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়াই হলো ঘরে হাম রোগীর পরিচর্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
