মুক্তিকামী বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ভয়াল কালরাতে একাত্তরের শহীদদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতি।
বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে শহীদদের স্মরণে গণসমাধিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শোক, নীরবতা আর আলোয় ভেসে ওঠে ইতিহাসের রক্তাক্ত সেই রাতের স্মৃতি।
এছাড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও মোমবাতি প্রজ্বালন ও চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশে ভয়াবহ নৃশংসতা চালানো শুরু করে পাকিস্তান, দিনটি বাঙালি স্মরণ করে গণহত্যা দিবস হিসেবে।
সেই রাতের অপারেশন সার্চলাইটের বীভৎসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের তাড়না নিয়ে নয় মাসে বিজয় অর্জন করে মুক্তিযোদ্ধারা।
তেইশ বছরের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে বাঙালি যে লড়াই চালিয়ে আসছিল, তা নির্মূল করতেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নামে ঢাকায় ব্যাপক গণহত্যা চালায় পাকিস্তান।
২৫ মার্চের কালরাতে যা ঘটে
রাত ১০টার দিকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বড় কনভয় যুদ্ধ সাজে শহরের দিকে রওনা হয়।
শহরমুখী সেনাবাহিনীর মেকানিক্যাল কলামটি প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেটে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সেখানে বড় বড় গাছের গুঁড়ি, অকেজো স্টিম রোলার এবং ভাঙা গাড়ির স্তূপ জমিয়ে রাখা হয় হানাদারদের পথ আটকানোর জন্য।
গুলি করে এ প্রতিরোধ ভেঙে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাংকগুলো সামনে এগিয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ সেসময়ের রেসকোর্স ময়দানের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সেনাবাহিনীর অন্তত ৮০টি সাঁজোয়া যানকে পূর্ণ যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
রাত সাড়ে ১১টার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের কনভয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ শুরু করে।
ব্যারাকে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি করে।
একই সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২তম বালুচ রেজিমেন্টের সেনারা পিলখানায় ইপিআরের ওপর হামলা করে। এখানেও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে বাঙালিরা।
পিলখানা ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারি বাজারসহ সমগ্র ঢাকায় শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় রাতের অন্ধকারে গুলি, বোমা আর ট্যাংকের আওয়াজে প্রকম্পিত হয় পুরো শহর।
সেনাবাহিনী সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা এবং বস্তিবাসীর ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতা চালায়।
রাত ১টার পর পাকিস্তানের সেনারা ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান নিয়ে ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান।
এরপর নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
২০১৭ সাল থেকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসাবে পালন করে আসছে বাংলাদেশ, গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রচেষ্টাও চলছে।
