পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরুর মাংসের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দাম বেড়েছে, অনেক রেস্তোরাঁ মেনু থেকে গরুর মাংসের পদ বাদ দিয়েছে এবং বহু পরিবার খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতার ট্যাংরা এলাকার একমাত্র গবাদিপশু জবাইখানা মে মাস থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হওয়ার চার দিন পর, ১৩ মে রাজ্য সরকার গবাদিপশু জবাইসংক্রান্ত বিধি কঠোরভাবে মানার নির্দেশ দেয়।
নতুন করে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করলে গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর ও নির্দিষ্ট শ্রেণির মহিষ জবাই করা যাবে না।
জবাইয়ের আগে সংশ্লিষ্ট প্রাণীকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে জবাইয়ের উপযোগী- এমন সনদ নিতে হবে।
সাধারণত ১৪ বছরের বেশি বয়সী, কাজ বা প্রজননে অক্ষম কিংবা বয়স, আঘাত, বিকৃতি বা নিরাময়-অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম প্রাণীর ক্ষেত্রে এই সনদ দেওয়া যেতে পারে।
কমেছে সরবরাহ, বেড়েছে দাম
নির্দেশনা জারির পর থেকেই কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজারে গরুর মাংসের সংকট দেখা দেয়। তিন মাসের বেশি সময় পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
কলকাতায় আগে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ রুপি। এখন তা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপিতে উঠেছে। রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের ভুনার প্লেটের দাম ১০০ রুপি থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০ রুপি।
দাম বাড়লেও বিক্রি কমেছে। ট্যাংরার এক খাবারের দোকানির দাবি, তার দোকানে গরুর মাংসের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।
সরবরাহ কমে যাওয়া, মাংসের মান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতে অনেকে ভয় পাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
মেনু থেকে বাদ গরুর মাংস
সরবরাহ সংকটের কারণে কলকাতার অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত কয়েক মাসে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ বন্ধ করে দিয়েছে।
কলকাতার পরিচিত রেস্তোরাঁ জম জম- এর তিনটি শাখাতেই গরুর মাংসের পদ বাদ দেওয়া হয়েছে।
রেস্তোরাঁটির পরিচালনা কর্তৃপক্ষের দাবি, মানসম্মত মাংস না পাওয়ায় তারা এসব পদ চালু রাখতে পারেনি। এতে ব্যবসায় প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে এবং কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।
১৯৪৭ সাল থেকে কলকাতার পরিচিত রেস্তোরাঁ Olypub- ও নিয়মিত গরুর মাংসের স্টেক সরবরাহ করতে পারছে না।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেনু থেকে পদটি বাদ দেওয়া হয়নি; তবে মাংসের নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় যখন পাওয়া যায়, তখনই এটি পরিবেশন করা হচ্ছে।
বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই গরুর মাংসের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের গ্রামীণ পরিবারের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহুরে পরিবারের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ গরু বা মহিষের মাংস খাওয়ার কথা জানিয়েছে।
মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিস্টান, দলিত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এবং কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের খাদ্যতালিকাতেও গরুর মাংস রয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটে অনেক পরিবার মাংসের বিকল্প হিসেবে মাছ, সবজি ও মুরগির দিকে ঝুঁকছে।
কলকাতার কাছের এক বাসিন্দা জানান, আগে তাদের পরিবার প্রায় প্রতিদিন গরুর মাংস খেত। এখন তা কমে সপ্তাহে এক-দুই দিনে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে পরিবারের সাপ্তাহিক খাবারের খরচও প্রায় ৫ হাজার রুপি থেকে বেড়ে ৭ হাজার রুপি হয়েছে বলে জানান তিনি।
মালদা জেলায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, গরুর মাংস খাওয়াই দিন দিন ‘গোপনীয়’ ব্যাপার হয়ে উঠছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষ্য, পরিচিত কারও মাধ্যমে গোপনে গরুর মাংস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গ্রেপ্তার বা হয়রানির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়
ভারতের বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যে গবাদিপশু জবাই ও গরুর মাংস বিক্রির ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে।
রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা ও উত্তরাখণ্ডে গরুর মাংস বিক্রি বা গরুর মাংসজাত পণ্যের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকেও গবাদিপশু জবাই ও মাংসের বেচাকেনা নিয়ে কঠোর বিধি রয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে জবাইসংক্রান্ত আইনটি নতুন নয়। তবে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর প্রয়োগ আরও কঠোর হয়েছে।
এদিকে কলকাতা পৌর কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্যের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের কর্মকর্তারা ট্যাংরা জবাইখানা ও মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে পরস্পরের ওপর দায় চাপিয়েছেন।
ফলে কলকাতায় গরুর মাংসের ব্যবসা কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
