আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মাদুরোর জন্য ‘পদত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ’ হবে।
একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, মাদুরো যদি ‘কঠোর হওয়ার চেষ্টা করেন’ তবে সেটিই হবে তার ‘শেষবার’।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সাংবাদিকদের সঙ্গে এ কথা বলেন ট্রাম্প।
এ সময় তার পাশে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
গত চার মাস ধরে কারাকাসের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের অংশ হিসেবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে পারে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘মাদুরের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া পুরোপুরি তার ওপর নির্ভর করছে। আমি মনে করি, তার জন্য সেটাই বুদ্ধিমানের হবে। তবে আমরা দেখব কী হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সে যদি কিছু করতে চায়, যদি কঠোর হওয়ার চেষ্টা করে-তাহলে সেটাই হবে তার জীবনে শেষবার কঠোর হওয়ার সুযোগ।’
তেল ট্যাংকার জব্দের অভিযান
এই হুমকি এমন সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড ভেনেজুয়েলার উপকূলে দ্বিতীয় দিনের মতো একটি তৃতীয় তেল ট্যাংকার ধাওয়া করছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, এই জাহাজটি ভেনেজুয়েলার তথাকথিত ‘ডার্ক ফ্লিট’-এর অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত হয়।
এবিষয়ে ট্রাম্প বলেন, জাহাজটি চলমান অবস্থায় আছে, শেষ পর্যন্ত আমরা সেটি ধরব।’ তিনি জানান, ইতোমধ্যে জব্দ করা দুটি জাহাজ ও প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্র রেখে দেবে।
তিনি আরও বলেম, হয়তো আমরা তেল বিক্রি করব, হয়তো রেখে দেব, অথবা কৌশলগত মজুতে ব্যবহার করব। জাহাজগুলোও আমাদের কাছেই থাকবে।’
মাদুরোর পাল্টা জবাব
ট্রাম্পের বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিকোলাস মাদুরো। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উচিত নিজের দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া, কারাকাসকে হুমকি না দেওয়া।
মাদুরো বলেন, ‘তিনি যদি নিজের দেশের বিষয়গুলো সামলান, তবে নিজের দেশ ও বিশ্বের জন্যই তা ভালো হবে।’
সামরিক তৎপরতা ও বিতর্ক
ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ তেল খাতকে লক্ষ্য করে এই অভিযানের পাশাপাশি অঞ্চলটিতে বড় ধরনের মার্কিন সামরিক তৎপরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, এসব অভিযান মাদক পাচার দমনের উদ্দেশ্যে।
তবে সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এসব হামলার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযানে এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ।
সোমবার ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাদক বহনের সন্দেহে একটি ‘লো-প্রোফাইল ভেসেল’-এ হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা মাদক পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে দেশটির বিশাল তেল মজুত দখলের জন্য মাদুরো সরকারকে উৎখাত করতে চাইছে। তারা মার্কিন জাহাজ জব্দের ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
জাতিসংঘে বৈঠক, রাশিয়া-চীনের সমর্থন
ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার অনুরোধে ডাকা এই বৈঠককে সমর্থন দিয়েছে রাশিয়া ও চীন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিলের সঙ্গে ফোনালাপে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি মস্কোর পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি রয়েছে।
চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতির পরিপন্থী।’
তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার স্বাধীনভাবে উন্নয়ন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা করার অধিকার রয়েছে। ‘চীন ভেনেজুয়েলার বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার অবস্থানকে সমর্থন করে।’
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
এদিকে ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মাদুরোর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠ করে শোনান, যা জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর উদ্দেশে লেখা। এতে সতর্ক করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও জাহাজ জব্দের ফলে বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
চিঠিতে বলা হয়, ‘ভেনেজুয়েলা শান্তির পক্ষেই রয়েছে, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও সম্পদ রক্ষায় প্রস্তুত।’
এতে আরও সতর্ক করা হয়, এই আগ্রাসনের প্রভাব শুধু ভেনেজুয়েলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে এবং বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও বিশ্বের দুর্বল অর্থনীতিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
