ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, পড়াশোনার চাপ কিংবা বন্ধুত্বের সমস্যা- শিশুদের জীবনেও নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতি সামলে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তৈরি করতে বাবা-মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সুজান জে. সংয়ের মতে, মানসিকভাবে শক্ত শিশু তৈরি হয় শুধু কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করার মাধ্যমে নয়। বরং সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা এবং কঠিন সময়ের মধ্যেও সক্রিয় থাকার অভ্যাস থেকে এই সক্ষমতা গড়ে ওঠে।
শিশুদের নিয়ে প্রায় ১৮ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অভিভাবকদের প্রতি পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন।
১. সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাও দিন
শিশুকে এমন কোনো কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করতে হবে, যেটি সে পছন্দ করে এবং সময় নিয়ে শিখতে আগ্রহী। শুরুতে সে ভালো নাও করতে পারে। কিন্তু চেষ্টা, ভুল ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উন্নতি করার সুযোগ দিতে হবে।
কোনো পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া, খেলায় বাদ পড়া বা কোনো প্রতিযোগিতায় সফল না হওয়ায় শিশু হতাশ হলে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে তাকে কিছুটা সময় দিতে হবে।
পরে শান্ত হলে জানতে চাওয়া যেতে পারে- কোন অংশটি সবচেয়ে কঠিন ছিল? পরেরবার কী ভিন্নভাবে করা যায়?
এভাবে শিশু বুঝতে শেখে, কোনো কাজে প্রথমবার ব্যর্থ হওয়া মানেই সে ভবিষ্যতেও ব্যর্থ হবে- এমন নয়।
২. নির্দিষ্ট পেশার বদলে সমস্যা খুঁজে নিতে শেখান
সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট পেশায় যাবে- এমন পরিকল্পনা করে তাকে গড়ে তোলার বদলে কোন বিষয়গুলো তাকে সত্যিই ভাবায়, সেদিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সং।
যেমন, কোনো শিশু সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বিরক্ত হলে তাকে শুধু ‘মেরিন বায়োলজিস্ট হও’ না বলে প্রশ্ন করা যেতে পারে- বিষয়টি তাকে কেন বিরক্ত করছে? এর সমাধানে কী করা যেতে পারে?
এরপর সে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে পারে, কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে পারে কিংবা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে।
এতে শিশু নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সমস্যা চিহ্নিত করে সেটি নিয়ে কাজ করার অভ্যাস তৈরি করতে পারে।
৩. মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে শেখান
শিশুর ব্যক্তিগত ও ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, বিশ্বাস তৈরি, মতবিরোধ মেটানো, প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া, সীমারেখা নির্ধারণ এবং সম্পর্ক ধরে রাখার মতো দক্ষতাও শেখানো প্রয়োজন।
বন্ধুর সঙ্গে ঝামেলা হলে বাবা-মা শুধু কে দোষী তা নির্ধারণ না করে শিশুকে প্রশ্ন করতে পারেন- কী ঘটেছিল? অন্য শিশুটি কী অনুভব করে থাকতে পারে? এই সম্পর্কটি ঠিক করা কি গুরুত্বপূর্ণ?
বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণও শিশুর জন্য উদাহরণ হতে পারে। যেমন, সকালে সন্তানের সঙ্গে রাগারাগি হলে পরে বাবা-মা নিজের ভুল স্বীকার করে নিতে পারেন।
৪. নিজের সমস্যার বাইরেও তাকাতে শেখান
কোনো সমস্যা হলে মানুষ সহজেই শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে ভাবতে শুরু করে। শিশুর ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে।
তাই তাকে অন্যের কাজে লাগার সুযোগ দিতে পারেন বাবা-মা। ছোট শিশু পোষা প্রাণীকে খাবার দিতে পারে, বড় শিশু ছোট ভাই-বোনকে পড়ায় সাহায্য করতে পারে, প্রতিবেশীর খোঁজ নিতে পারে কিংবা পরিবারের কোনো কাজে দায়িত্ব নিতে পারে।
উদ্দেশ্য শিশুকে তার নিজের সমস্যা ভুলিয়ে দেওয়া নয়। বরং কঠিন সময়েও সে অন্যের জন্য কিছু করতে পারে এবং তারও প্রয়োজনীয়তা আছে- এই অনুভূতি তৈরি করা।
৫. সন্তানকে সঙ্গে সঙ্গে ভালো করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না
সন্তান কষ্ট পেলে বাবা-মায়ের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো দ্রুত তাকে ভালো করে দেওয়া। কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পেলে ‘চিন্তা করো না’ বা ‘এরপর আরও অনেক অনুষ্ঠান হবে’- এমন কথা বলে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু সং-এর মতে, মানসিকভাবে শক্ত শিশুরাও হতাশা, ভয়, লজ্জা ও দুঃখ অনুভব করে। পার্থক্য হলো, তারা এসব অনুভূতি নিয়েও স্কুলে যেতে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে, আবার চেষ্টা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে শেখে।
তাই সন্তান কষ্ট পেলে প্রথমেই সেই অনুভূতি দূর করার চেষ্টা না করে বলা যেতে পারে- ‘এটা সত্যিই কষ্টের। তোমার খারাপ লাগছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি।’
এরপর তাকে সেই অনুভূতিটি কাটিয়ে ওঠার সময় দিতে হবে।
ব্যর্থতা এবং কষ্টও শেখার অংশ
সুজান সং-এর মতে, মানসিক দৃঢ়তা শুধু কঠিন পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় না। বরং শিশু যখন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখে যে ব্যর্থতা, হতাশা বা দুঃখের পরও জীবন এগিয়ে যায়, তখন তার মধ্যে প্রতিকূলতা মোকাবিলার ক্ষমতা তৈরি হয়।
তাই সন্তানকে সব সমস্যা থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে নিরাপদ পরিবেশে কিছুটা চেষ্টা, ভুল, ব্যর্থতা ও নিজে সমস্যা সমাধানের সুযোগ দেওয়াও তার ভবিষ্যৎ মানসিক শক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
