রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ইউরোপের আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে কেন?

শুক্রবার তিনটি রুশ মিগ-৩১ যুদ্ধবিমান প্রায় ১২ মিনিট এস্তোনিয়ার আকাশে ঢুকে চক্কর দেয়। ন্যাটোর দাবি, তারা রুশ যুদ্ধবিমানকে নিজেদের সীমা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।

এর আগে পোল্যান্ডের আকাশে রাশিয়ার বেশ কিছু ড্রোন উড়তে দেখা যায়।

লাটভিয়া ও রোমানিয়ায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের টুকরো পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে থাকা রাশিয়া কেন ইউরোপের অন্য দেশগুলোর আকাশেও ঢুকছে? রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কি যুদ্ধক্ষেত্র আরও বাড়াতে চাচ্ছেন, নাকি অন্য কোন বার্তা দিচ্ছেন?

ন্যাটো বলছে, এগুলো সবই ইচ্ছাকৃত চাপ প্রয়োগ ও ইউরোপীয়দের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়ার কৌশল।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো এসব ঘটনাকে “বেপরোয়া ও উসকানিমূলক” হিসেবে দেখছে। এর জবাবে ইউরোপের পূর্ব ফ্রন্টে নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল দাঁড় করানোর পাশাপাশি মস্কোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েও পরিকল্পনা চলছে।

কি ঘটছে?

চলতি মাসে ইউরোপের চারটি দেশ নতুন করে রুশ যুদ্ধ সরঞ্জামের নিশানায় এসেছে।

এস্তোনিয়া: শুক্রবার তিনটি রুশ মিগ-৩১ যুদ্ধবিমান ফ্লাইট প্ল্যান ছাড়াই, ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে এবং কোন রেডিও বার্তার উত্তর না দিয়ে এস্তোনিয়ার আকাশে ঢুকে পড়ে। ন্যাটোর ইতালীয় এফ-৩৫ বিমান এগুলোকে তাড়িয়ে দেয়।

পোল্যান্ড (৯–১০ সেপ্টেম্বর): টানা দুই দিনে প্রায় ২০টির বেশি রুশ ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশে প্রবেশ করে। কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত হয়।

রোমানিয়া ও লাটভিয়া: ইউক্রেন সীমান্তবর্তী এলাকায় রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো পড়তে দেখা যায়।

রাশিয়া কি চায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার এই ধরনের পদক্ষেপের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

শক্তি প্রদর্শন ও ভয় দেখানো– মস্কো দেখাতে চায়, ইউরোপের সীমান্তে সবসময়ই সামরিক ক্ষমতা দেখানোর সক্ষমতা আছে রুশদের।

ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা- রাশিয়াকে মোকাবেলায় ন্যাটো কত দ্রুত বিমান ওঠা পারবে, তাদের রাডার কভারেজ কতটা শক্তিশালী; এগুলো যাচাই করাও এসব তৎপরতার কারণ হতে পারে।

সম্পদ অপচয় ঘটানো- ছোট ছোট অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ন্যাটো দেশগুলোকে বারবার প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করার কৌশল নিতে পারেন পুতিন। ফলে ইউরোপের ঘাড়ে আরও সামরিক ব্যয় চাপিয়ে দেয়া সহজ হবে।

রাজনৈতিক কৌশল- ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যে সামরিক মহড়া বাড়িয়ে কূটনৈতিক চাপ তৈরির জন্যও এসব অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে।

দুর্ঘটনা নয়, ইচ্ছাকৃত– মাঝে মাঝে ভুল করে কোন দেশ অন্যের আকাশসীমায় ঢুকে পড়তে পারে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ইচ্ছাকৃত বলছেন বিশ্লেষকরা।

যা বলছে ইউরোপীয়রা

ন্যাটো বলছে, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে রাশিয়া বেপরোয়া আচরণের প্রমাণ দিচ্ছে, যার জবাব দিতে ন্যাটো সবসময় প্রস্তুত আছে।

আর এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখাল বলেছেন, “এমন লঙ্ঘন একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।”

ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের প্রতিশ্রুতি, “এস্তোনিয়ার পাশে ইউরোপ দাঁড়াবে।”

একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যও রাশিয়ার আচরণ উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক বলছে।

যুদ্ধের ঝুঁকি কতটা?

রুশ যুদ্ধবিমানগুলো প্রায়ই ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে, ফ্লাইট প্ল্যান ছাড়া, রেডিওতে সাড়া না দিয়ে অন্য দেশের আকাশে ঢুকে পড়ছে।

এর ফলে ভুল বোঝাবুঝি বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে, এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত রাশিয়া সরাসরি ন্যাটো দেশে হামলার কোন ইঙ্গিত দেয়নি, তবুও একটি দুর্ঘটনা বা ভুল প্রতিক্রিয়া বড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে।

ন্যাটো ও ইইউ কী করছে?

সামরিক ব্যবস্থা: ‘ইস্টার্ন সেনট্রি’ মিশনের আওতায় অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও আকাশ প্রতিরক্ষা মোতায়েন করেছে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: ইইউ রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা: ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষার সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলছে ন্যাটো।

আরও কি হতে পারে?

পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে থাকা রাশিয়া নতুন যে কৌশল নিয়েছে, তা সহজেই থামবে না- মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

কিন্তু সামনে আর কি হতে পারে?

আরও অনুপ্রবেশ: রাশিয়া ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে ভবিষ্যতেও এমন কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

ন্যাটোর প্রতিরোধ জোরদার: ন্যাটো আরও দৃশ্যমানভাবে বিমান ও প্রতিরক্ষা মোতায়েন করতে পারে।

দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি: সবচেয়ে ভয়াবহ ঝুঁকি- যা মুহূর্তে বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সবশেষ বলা যায়, এস্তোনিয়ার আকাশসীমায় রুশ যুদ্ধবিমানের অনুপ্রবেশ সাম্প্রতিক মাসগুলোর একাধিক ঘটনারই ধারাবাহিকতা।

বিশ্লেষকরা এটিকে “গ্রে-জোন কৌশল” বলছেন- যেখানে সরাসরি যুদ্ধ নয়, কিন্তু চাপ সৃষ্টি ও ভয় দেখানো হয়।