দিল্লির একদিন পরেই-ইসলামাবাদে বিস্ফোরণ: কি বলছে দুই দেশ ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লার সামনে এবং পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এঘটনায় দুই দেশের অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। মাত্র একদিনের ব্যবধানে দুই দেশের এমন ঘটনা ভিন্ন আঙ্গিকেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী একে “পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা” বলে সন্দেহ করছে। এমনকি ঘটনাগুলোর পর সীমান্ত অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

লালকেল্লার সামনে হঠাৎ ভয়াবহ বিস্ফোরণ

বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে নয়াদিল্লির ব্যস্ত লালকেল্লা এলাকায় হঠাৎ একটি বেসরকারি গাড়িতে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে গাড়িটি সঙ্গে সঙ্গে আগুনে পুড়ে যায়। পুলিশ জানায়, এতে অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

দিল্লি পুলিশের কমিশনার এস. এন. শ্রীবাস্তব বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে গাড়িতে বিস্ফোরক রাখা ছিল। ঘটনাস্থল থেকে কিছু আইইডি-জাতীয় উপাদান উদ্ধার করা হয়েছে।”

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক টুইটে বলেন, “এটি একটি কাপুরুষোচিত হামলা। দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।”

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।”

ঘটনার পর লালকেল্লা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কড়া নিরাপত্তা জারি করা হয়েছে। তদন্তে যোগ দিয়েছে জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)।

ইসলামাবাদে আদালতের সামনে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ

দিল্লির ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর ইসলামাবাদের জেলা আদালতের বাইরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। পুলিশের ধারণা, এটি একটি আত্মঘাতী হামলা ছিল। এতে অন্তত ১২ জন নিহত হন, আহত হন ২০ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্যও আছেন।

ইসলামাবাদের পুলিশপ্রধান সৈয়দ আলী আব্বাস বলেন, “হামলাকারী আদালতের প্রবেশপথে থাকা নিরাপত্তা চৌকিতে এসে বিস্ফোরণ ঘটায়। উদ্দেশ্য ছিল বেশি সংখ্যক হতাহত ঘটানো।”

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি বলেন, “আমরা এই হামলার নেপথ্যে কারা আছে, তা খুঁজে বের করব। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জড়িত থাকতে পারে।”

দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া

দুই দেশেই ঘটনাটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ভারত যেখানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছে, পাকিস্তান সেখানে হামলার পেছনে “আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের” ইঙ্গিত দিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক বিবৃতিতে বলেন, “দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা সফল হবে না। যারা এর পেছনে আছে, তাদের মদদদাতাদেরও শনাক্ত করা হবে।”

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করেনি, তবে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “দুই ঘটনার সময়কাল ও পদ্ধতি একরকম। এটি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়।”

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

দুই দেশের ঘটনাকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নয়াদিল্লির সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক অনুরাধা সেন বলেন, “দুই দেশের রাজধানীতে একই দিনে হামলা নিছক ঘটনাচক্র নয়। এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিত।”

ইসলামাবাদভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক তৌফিক ইউসুফ বলেন, “টিটিপি বা অন্য গোষ্ঠীগুলো যদি সমন্বিতভাবে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করে থাকে, তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমিত সহযোগিতাও জরুরি হয়ে উঠবে।”

সীমান্তে সতর্কতা, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

দুই দেশের সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কাশ্মীরসহ সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান দ্যুজারিক এই হামলার নিন্দা জানিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ তদন্তের আহ্বান জানান তিনি।

আহতদের চিকিৎসা ও তদন্ত চলমান

উভয় শহরেই আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দিল্লির লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে ১৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। ইসলামাবাদে নিহতদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

দুই দেশের পুলিশই জানিয়েছে, এখনো কোনো গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না আসার আহ্বান জানিয়েছে তারা।