তালেবানের সঙ্গে যেভাবে ‘দূরত্ব বেড়েছে’ পাকিস্তানের

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

ভারতের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক গভীর হলেও বিপরীত চিত্র পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কে।

দুই পক্ষের ‘অবিশ্বাসের সম্পর্ক’ শেষ পর্যন্ত সীমান্তে সেনা সদস্যদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শনিবার গভীর রাতে পাক-আফগান সীমান্তের পাঁচটি এলাকায় ব্যাপক গুলি বিনিময় হয়েছে।

দুই পক্ষের সামরিক সূত্রগুলোই, প্রতিপক্ষের সেনা চৌকি ও সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি করেছে।

আরও পড়ুন: সংঘাতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান, সীমান্তে ব্যাপক গোলাগুলি

এর আগে বৃহস্পতিবার তালেবান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালানোর অভিযোগ এনেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এর বদলা নিতে দলটির ঘোষণার মধ্যেই শনিবার সীমান্তে সংঘাতে জড়াল দুই দেশ।

প্রতিবেশি দেশ দুটির দুরত্ব এমন সময়ে সশস্ত্র সংঘাতে রুপ নিয়েছে, যখন ভারতের সঙ্গে তালেবান সরকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ভারত তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে কেন?

চলতি বছরই আরেক প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও যুদ্ধে জড়িয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের অভিযোগ, ভারত আফগানিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পাকিস্তানে হামলা চালানোর অর্থ দিচ্ছে, আর এসব যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তালেবান।

যে কারণে সংঘাতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান

প্রতিবেশী দেশ দুটির সম্পর্কের অবনতির শুরু হয়েছে কাবুলের ক্ষমতা তালেবানের হাতে যাওয়ার পর থেকে।

পাকিস্তানের দাবি, ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেভাবে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, তা পাকিস্তান কখনোই চায় না- এমন দাবি করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষমন্ত্রী।

খাজা আসিফ অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সম্মানজনক সম্পর্ক চাইলেও আফগানিস্তানের ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো হচ্ছে।

আর এটিই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে- বলছেন তিনি।

‘সন্ত্রাস ছড়ানোর’ অভিযোগ তালেবানের বিরুদ্ধে

পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, দেশটির খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসীদের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

এর জন্য তালেবানকে দায়ী করে আসছে ইসলামাবাদ।

আরও পড়ুন: আত্মঘাতী হামলায় পাকিস্তানে ১৬ সেনা সদস্য নিহত

খাজা আসিফ বলেন, “সীমান্তের ওপাড়ে যারা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের বিষয়ে স্থানীয়রা জানে। কেউ যদি নীরব থাকে, তার মানে সে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছে।

“পাকিস্তান কোন দেশকেই তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপ করতে দিবে না।”

বলা হচ্ছে, তালেবান সরকারের সঙ্গে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে; যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ আসছে।

কাবুল সরকার টিটিপিকে সব ধরণের সহায়তা দিচ্ছে, এমন অভিযোগ পাঠানো হয়েছে জাতিসংঘেও।

গেল বৃহস্পতিবার তালেবান অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পিছনেও কারণ হিসেবে আসছে টিটিপি।

উদ্বেগ সীমান্ত ঘিরে

দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।

বাণিজ্য ও পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্তই এখন সন্ত্রাসবাদের প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে- এমন অভিযোগ পাকিস্তানের।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সীমান্ত এলাকার সন্ত্রাস বন্ধে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে কাবুলের সঙ্গে আলোচনা করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

তিনি মনে করেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয়া শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, আফগানিস্তানের নিজের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।

জেনারেল চৌধুরীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আফগানিস্তান ছাড়ার সময় প্রচুর মার্কিন অস্ত্র রেখে যান, যা এখন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে রয়েছে।

“আমরা আফগান কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিয়েছি যে তাদের ভূমি থেকে পাকিস্তানে হামলা হচ্ছে”, বলেন তিনি।

আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?

সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সেনাদের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সঙ্গে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সন্দেহ যত বাড়বে, সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা তত কঠিন হবে।

1 thought on “তালেবানের সঙ্গে যেভাবে ‘দূরত্ব বেড়েছে’ পাকিস্তানের”

Comments are closed.