আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
এ যেনো সিনেমার গল্প। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ও গোলা-বারুদ নিয়ে ভিলেনের বিরুদ্ধে অভিযান। মেক্সিকোতে মাদক সম্রাটকে ধরতে এক রুদ্ধশ্বাস গল্প।
মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদক চক্র কার্টেল হালিস্কো নিউ জেনারেশন এর প্রধান নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই ছিলেন দেশটির সবচেয়ে মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী। অবশেষে এক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে তাঁকে ঘিরে ফেলে মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী। তবে গ্রেপ্তার অভিযানের শেষ পরিণতি হয় প্রাণঘাতী।
যেভাবে অভিযান শুরু
নিরাপত্তা সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থ বা মাদক রুট নয়- এই অভিযানের সূত্র মেলে এল মেনচোর প্রেমিকার গতিবিধি অনুসরণ করে। গোয়েন্দারা প্রথমে ওই নারীর সহযোগী এক ব্যক্তিকে নজরদারিতে আনেন। তাঁর চলাফেরা অনুসরণ করতে থাকেন। পরে তাকে অনুসরণ করেই পৌঁছে যান হালিস্কো অঙ্গরাজ্যের পাহাড়ি-জঙ্গলঘেরা শহর তাপালপা-তে।
ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যবাহী এই পর্যটনশহরের অদূরে গভীর জঙ্গলের ভেতর একটি কেবিনে আশ্রয় নিয়েছিলেন এল মেনচো। অন্তত কয়েক দিন ধরে তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সঙ্গে ছিল তাঁর সশস্ত্র দেহরক্ষী দল।
ভোরের অভিযানে গোলাগুলি
রোববার ভোরে বিশেষ বাহিনী তাপালপা ঘিরে ফেলে। আকাশপথে হেলিকপ্টার ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়, স্থলপথে অবস্থান নেয় সশস্ত্র ইউনিট। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে এল মেনচো পালানোর চেষ্টা করেন। তখনই শুরু হয় তীব্র বন্দুকযুদ্ধ।
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল রিকার্দো ত্রেভিয়া ত্রেহো জানান, কার্টেল সদস্যদের কাছে ভারী অস্ত্র ছিল এবং সংঘর্ষ ছিল অত্যন্ত সহিংস। গোলাগুলিতে কয়েকজন সন্দেহভাজন কার্টেল সদস্য নিহত হন। পালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন এল মেনচো ও তাঁর দুই দেহরক্ষী।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের হেলিকপ্টারে করে গুয়াদালাহারার একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। পরে তাঁদের মরদেহ পাঠানো হয় মেক্সিকো সিটিতে।
মৃত্যুর পরপরই দেশজুড়ে সহিংসতা
এল মেনচোর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই মেক্সিকোর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মহাসড়ক অবরোধ, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বহু হতাহতের খবর পাওয়া যায়।
প্রতিশোধমূলক হামলা ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৩২টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে অন্তত ২০টিতে। উড়োজাহাজ ও বাস চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় কয়েকটি রুটে। হাজারো যাত্রী ও পর্যটক আটকা পড়েন।
সোমবার বিকেল নাগাদ পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছেন জেনারেল ত্রেহো। নিরাপত্তা বাহিনী দেশজুড়ে টহল জোরদার করেছে, বহু সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে এখনও পোড়া যানবাহন, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
তাপালপার মেয়র আন্তোনিও মোরালেস দিয়াজ জানিয়েছেন, তাঁর শহর সাধারণত শান্ত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অভিযানের পর কয়েকটি সড়কে ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছিল এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়।
এল মেনচো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রেরও শীর্ষ মোস্ট ওয়ান্টেডদের একজন; তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তাঁর মৃত্যুকে মেক্সিকোর জন্য বড় নিরাপত্তা সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, কার্টেলের ভেতরে নেতৃত্বের লড়াই বা বিভক্তি নতুন সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।
