পৃথিবীর শেষ প্রান্তের নিঃশব্দ বিস্ময়

যাযাবর মিন্টু

পৃথিবীর মানচিত্রে নিচের একেবারে প্রান্তে, বরফের অশেষ সাদা চাদরে ঢাকা এক রহস্যময় ভূমি দক্ষিণ মেরু। এখানে নেই কোনো স্থায়ী নগরসভ্যতা, নেই গাছপালা বা চাষাবাদ। আছে কেবল বরফ, তুষারঝড় আর নীরবতার এক বিশাল সাম্রাজ্য। তবু এই নীরব ভূমিই আজ বিশ্ববিজ্ঞান, জলবায়ু গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য কেন্দ্র।

কোথায় এই দক্ষিণ মেরু?

দক্ষিণ মেরু অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের অন্তর্গত। এটি পৃথিবীর দক্ষিণতম বিন্দু, যেখানে সব দ্রাঘিমা রেখা এসে মিলিত হয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময় এখানে তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের বহু নিচে শীতকালে তা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে।

এখানে ছয় মাস দিন, ছয় মাস রাত। গ্রীষ্মকালে সূর্য অস্ত যায় না, আর শীতকালে দীর্ঘ অন্ধকারে আকাশে দেখা যায় মনোমুগ্ধকর অরোরা অস্ট্রালিস দক্ষিণ মেরুর আকাশের রঙিন আলোর খেলা।

অভিযানের ইতিহাস

দক্ষিণ মেরু জয় মানুষের সাহস ও কৌতূহলের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। ১৯১১ সালে নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল্ড অ্যামুন্ডসেন প্রথম সফলভাবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছান। তার কিছুদিন পর ব্রিটিশ অভিযাত্রী রবার্ট ফ্যালকন স্কটের দলও সেখানে পৌঁছায়, তবে ফেরার পথে তারা প্রাণ হারান। এই প্রতিযোগিতা ইতিহাসে ‘রেস টু দ্য সাউথ পোল’ নামে পরিচিত।

গবেষণার কেন্দ্র

বর্তমানে দক্ষিণ মেরুতে বিভিন্ন দেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যামুন্ডসেনÑ স্কট সাউথ পোল স্টেশন’ উল্লেখযোগ্য। এখানে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তন, বরফস্তরের গঠন, মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন।

দক্ষিণ মেরুর বরফস্তরে জমে থাকা হাজার হাজার বছরের বরফস্তর পৃথিবীর অতীত জলবায়ুর তথ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। তাই এই অঞ্চল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণের উপস্থিতি

দক্ষিণ মেরুর মূল ভূখণ্ডে স্থায়ী প্রাণী খুব কম থাকলেও উপকূলীয় এলাকায় পেঙ্গুইন, সীল ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর দেখা মেলে। বিশেষ করে অ্যাম্পেরার পেঙ্গুইন কঠোর শীতেও টিকে থাকার এক বিস্ময়কর উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও শান্তির ভূমি

১৯৫৯ সালে স্বাক্ষরিত অ্যান্টার্কটিক ট্রিটি অনুযায়ী, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশকে শান্তিপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এখানে কোনো দেশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা খনিজ সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে এটি পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ, যা মূলত সহযোগিতা ও বিজ্ঞানের জন্য নিবেদিত।

কেন গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ মেরু?

দক্ষিণ মেরু কেবল বরফের প্রান্তর নয়; এটি পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানকার বরফ গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো হুমকির মুখে পড়বে। তাই দক্ষিণ মেরুকে বোঝা মানে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বোঝা।

সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ মেরু একদিকে যেমন প্রকৃতির কঠোরতার প্রতীক, তেমনি মানবসাহস, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও প্রতীক। সভ্যতার কোলাহল থেকে বহু দূরে এই সাদা ভূমি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবী এখনো বিস্ময়ে ভরা, আর সেই বিস্ময়কে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

লেখক: যাযাবর মিন্টু,  বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল আই