৫ আসনে প্রার্থী দিলেও খুলনা-১ আসন নিয়ে জটিলতায় বিএনপি

আবু হানিফ, খুলনা

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করছে বিএনপি। এর মধ্যে কিছু আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি আর কিছু আসন জোটের শরিকদের জন্য রেখে দিয়েছে দলটি।

এদিকে, খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও একটিতে করেনি। সেটি হলো খুলনা -১ আসন।

খুলনা-১ আসন নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ ও জটিলতা। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে একটি বিশেষ বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে খুলনা ১ আসন । ভৌগোলিকভাবে এটি দুটি উপজেলা—বটিয়াঘাটা ও দাকোপ—নিয়ে গঠিত।

তবে এ আসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো নদী দ্বারা বিভক্ত সামাজিক কাঠামো। বলা যায়, খুলনা-১ মূলত “নদীর দুই পাড়ের আসন।” এই ভৌগোলিক বিভাজন কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যেও এর প্রভাব স্পষ্ট।

এক অংশে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম ও জনপদ, অন্য অংশে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল—এই ধর্মভিত্তিক সামাজিক বিন্যাস রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভিন্নতার মধ্য দিয়েই খুলনা-১ আসনের নির্বাচনী সমীকরণ গড়ে ওঠে। অতীতের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, খুলনা-১ আসনে আওয়ামীলীগের সবচেয়ে শক্ত অবস্থান ছিল।

১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৮ বার এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন, বিএনপি মাত্র ২ বার এবং জাতীয় পার্টি ১ বার।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হয়।পরবর্তীতে ১২ মে ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও তার সকল বিভাগের সব কার্যক্রম ও রাজনৈতিক দলীয় কাজ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে বিএনপির জন্য আসনটিতে জয় পেতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হতে পারে।

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ খায়র জয়ী হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপির সৈয়দ মোজাহিদুর রহমান আসনটি দখল করতে সক্ষম হন—যা দলের ইতিহাসে বিরল জয়গুলোর একটি।

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্তমান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আসনে ৫৩.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হয়েছেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে পঞ্চানন বিশ্বাস বিপুল ভোটে জয় পান—তিনি পেয়েছিলেন ১,৭২,১৫২ ভোট, যেখানে বিএনপির প্রার্থী আমির এজাজ খান পান মাত্র ২৮,৩২২ ভোট।সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও আওয়ামীলীগের সাংসদ ননী গোপাল মন্ডল জয় লাভ করেন।

তাই, খুলনা-১ আসনে বিএনপির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঐতিহাসিক দুর্বলতা। মাত্র দুইবারের জয় এই দলের জন্য বড় বাধা তৈরি করেছে।

তাছাড়া নদীবিভক্ত এই ভৌগোলিক কাঠামো এবং ধর্মভিত্তিক সামাজিক বৈষম্য বিএনপিকে ‘একক ভোটব্যাংক’ গঠনে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জটিলতার মধ্যেও সুযোগ লুকিয়ে থাকে। যদি বিএনপি শরীক দলগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে পারে এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় অংশে আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। বিশেষ করে যদি নির্বাচনী পরিবেশে পরিবর্তন আসে।

সব মিলিয়ে খুলনা-১ আসনটি বিএনপি কাকে যোগ্য মনে করছে কিংবা শরিকদের জন্য ছেড়ে দেবে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন।

ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য সবদিক থেকেই আওয়ামী লীগ এখানে প্রভাবশালী। তবুও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যদি বিএনপি সংগঠিত কৌশল ও স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক প্রচারণায় মনোযোগী হতে পারে, তবে এই নদীবিভক্ত আসনেই হয়তো তারা নতুন অধ্যায়ের সূচনা দেখতে পারে।