ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন এনসিপি’র ভবিষ্যতে কি হবে?

আল জাজিরার প্রতিবেদন:
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীন ছিলেন কুষ্টিয়ার তরুণ রুহুল আমিন। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন একটি গ্রহণযোগ্য ‘তৃতীয় শক্তি’র।

২০২৪ সালের ছাত্র-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীরা যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে, তখন আমিন মনে করেন-এবার হয়তো তাঁর পছন্দের দল মিলেছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। দলটির নেতারা ব্যাপক জনসমর্থন ও সম্ভাব্য নির্বাচনী সাফল্যের কথা বলেছিলেন। এমনকি ভবিষ্যতে সরকার গঠনের ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন কেউ কেউ।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দলটির সমর্থন এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ। সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং তৃণমূল কাঠামোর অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জোটের সিদ্ধান্ত ও ফলাফল

শেষ পর্যন্ত এনসিপি জোট করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটি এবং জয় পায় ৬টিতে।

নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট, যারা পায় ২১২টি আসন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন।

তবে ফলাফল নিয়ে হতাশ নন রুহুল আমিন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘নতুন দল হিসেবে আমরা খারাপ করিনি। এটা কেবল শুরু। আগামী কয়েকটি নির্বাচনে এনসিপিই বড় শক্তি হয়ে উঠবে।’

রাজপথ থেকে সংসদে

২০২৪ সালের ছাত্র-অভ্যুত্থানের সময় যাঁরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের কয়েকজন এখন সংসদ সদস্য। আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক এবং ঢাকার একটি আসন থেকে নির্বাচিত এমপি। তিনি বিরোধী জোটের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।

দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘১১ মাসের একটি দলের জন্য এটা ভালো ফলাফল। আমরা আরও বেশি আশা করেছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় সন্তুষ্ট।’

তিনি অভিযোগ করেন, ভোট গণনায় অনিয়মের কারণে দলটি আরও ২-৩টি আসন হারিয়েছে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরেননি।

জামায়াত জোটে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্ত দলটির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করে। এক সপ্তাহের মধ্যে এক ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ নেতা পদত্যাগ করেন। তাঁদের অভিযোগ-ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে আপস করে এনসিপি তার আদর্শিক অবস্থান দুর্বল করেছে।

সমালোচকদের মতে, জামায়াতের ঐতিহাসিক অবস্থান ও রক্ষণশীল রাজনীতি এনসিপির ঘোষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মধ্যপন্থী আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তবে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এটা রাজনৈতিক একীভূতকরণ নয়, কেবল নির্বাচনী জোট। আমাদের অবস্থান জামায়াতের অনুরূপ নয়।’

বিশ্লেষকদের মত

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক আসিফ বিন আলীর মতে, এনসিপি এখনো স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি।
‘নির্বাচনের পর থেকে দলটি জামায়াতের ছাতার নিচেই স্বাচ্ছন্দ্যে আছে,’ বলেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুমের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এনসিপির বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তিনি সংসদে প্রবেশকে ‘ইতিবাচক সূচনা’ হিসেবে দেখছেন।

সামনে কোন পথ?

এনসিপি জানিয়েছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা স্বতন্ত্রভাবে লড়তে চায়। যদিও জামায়াতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

সমালোচক আনিক রায়ের মতে, যদি আবার জামায়াতের সঙ্গে জোট করে, তবে তাদের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

এনসিপির জন্য এখন বড় প্রশ্ন-তারা কি জোটনির্ভর রাজনীতি ছাড়িয়ে নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবে? ছাত্র-অভ্যুত্থানের আবেগকে কি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারবে?

রুহুল আমিনের মতো সমর্থকদের বিশ্বাস, এটি কেবল শুরু। তিনি বলেন, আমরা রাজপথে শুরু করেছি, এখন সংসদে। আমরা আর পেছনে ফিরছি না।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা