মানবসভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসে যে নগরসভ্যতা পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্থাপত্যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, তার অন্যতম হলো মহেঞ্জোদারো।
প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এই শহর ছিল সিন্ধু সভ্যতার একটি প্রধান কেন্দ্র। বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে অবস্থিত এ প্রত্ননগর আজও গবেষকদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
১৯২২ সালে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন। মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থ- ‘মৃতদের ঢিবি’ । খননের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে এক সুসংগঠিত নগরজীবনের চিত্র।
মহেঞ্জোদারো ছিল সুপরিকল্পিত শহর। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-সোজা ও প্রশস্ত রাস্তা, যা গ্রিড প্যাটার্নে বিন্যস্ত। পাকা ইটের তৈরি দালান। উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কূপ ও গোসলখানা।
সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা হলো গ্রেট বাথ- একটি বিশাল স্নানাগার, যা সম্ভবত ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো। নগর পরিকল্পনার এমন নিখুঁত রূপ সেই সময়ের অন্য অনেক সভ্যতার তুলনায় অগ্রসর ছিল।
মহেঞ্জোদারোর মানুষ কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গম, যব ও তুলা ছিল প্রধান উৎপাদন। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা যায়, তাদের সঙ্গে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। সীলমোহর, পুঁতি ও ধাতব সামগ্রী তাদের উন্নত কারুশিল্পের প্রমাণ বহন করে।
সমাজে শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ছিল। ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও মাতৃদেবী ও পশুপতি আকৃতির মূর্তি পাওয়া গেছে, যা ধর্মীয় চর্চার ইঙ্গিত দেয়। তাদের নিজস্ব লিপি ছিল, তবে এখনো তা সম্পূর্ণরূপে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৯০০ সালের দিকে এই সভ্যতার পতন ঘটে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়-
নদীর গতিপথ পরিবর্তন। বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তন। অর্থনৈতিক অবনতি।
তবে সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো গবেষণার বিষয়।
মহেঞ্জোদারো প্রমাণ করে, প্রাচীন মানুষও উন্নত নগর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ ছিল। আধুনিক নগর পরিকল্পনার অনেক ধারণাই যেন সেই প্রাচীন সভ্যতার ধারাবাহিকতা।
তাই মহেঞ্জোদারো কেবল একটি প্রত্নস্থল নয়, এটি মানবসভ্যতার প্রাচীন জ্ঞান ও সৃজনশীলতার এক অনন্য দলিল।
