মায়া সভ্যতা ছিল প্রাচীন আমেরিকার অন্যতম উন্নত ও রহস্যময় সভ্যতা। মধ্য আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, স্থাপত্য ও লিপি ব্যবস্থায় তাদের অবদান আজও বিশ্বকে বিস্মিত করে।
মায়া সভ্যতার বিস্তার ছিল বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপ। এছাড়াও এদের বাস ছিল গুয়েতামালা, বেলিজ, হন্ডুরাস এবং ইএল সালভাদর অঞ্চলে।
সময়সীমা আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে খ্রিষ্টীয় ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত। তবে স্বর্ণযুগ ধরা হয় খ্রিষ্টীয় ২৫০ থেকে ৯০০ সাল- যাকে ‘ক্লাসিক পিরিয়ড’ বলা হয়।
মায়ারা বিশাল পিরামিড, প্রাসাদ, মন্দির ও খেলার মাঠ নির্মাণ করেছিল। তাদের বিখ্যাত নগরগুলোর মধ্যে রয়েছে- চিচেন ইৎজা, টিকাল এবং প্যালেনকো।
চিচেন ইৎজার ‘এল কাস্তিলো’ পিরামিড সূর্যের গতিপথ অনুযায়ী নির্মিত- যা তাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নত জ্ঞানকে প্রমাণ করে।
মায়ারা শূন্যের ধারণা ব্যবহারকারী প্রাচীন জাতিগুলোর অন্যতম। তাদের গণনা পদ্ধতি ছিল ২০ ভিত্তিক (ভিগেসিমাল)।
তারা অত্যন্ত নিখুঁত ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল, যার একটি অংশ পরিচিত ‘লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার’ নামে। ২০১২ সালে পৃথিবী ধ্বংসের গুজব এই ক্যালেন্ডারকে ঘিরেই ছড়িয়েছিল, যদিও তা ভুল ব্যাখ্যা ছিল।
মায়াদের নিজস্ব চিত্রলিপি ছিল, যা ‘মায়ান হায়ারোগ্লিফ’ নামে পরিচিত। পাথরের ফলক, দেয়াল ও বইয়ের মতো ভাঁজ করা ছাল-কাগজে তারা ইতিহাস, জ্যোতির্বিদ্যা ও ধর্মীয় আচার লিপিবদ্ধ করত।
তাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল। ভুট্টা ছিল প্রধান ফসল। সমাজে রাজা, পুরোহিত, যোদ্ধা, কৃষক ও শ্রমিক- এমন স্তরভিত্তিক কাঠামো ছিল। প্রতিটি নগর ছিল স্বাধীন নগর-রাষ্ট্র।
খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর পর হঠাৎ করে অনেক বড় শহর পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়- দীর্ঘমেয়াদি খরা, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন উজাড় ও পরিবেশ বিপর্যয়।
পরবর্তীতে ১৬শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের আগমনে মায়া সভ্যতার অবশিষ্ট শক্তিও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
মায়া সভ্যতা বিলীন হয়নি পুরোপুরি। আজও গুয়েতামালা ও মেক্সিকোতে লক্ষাধিক মায়া বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করছেন, যারা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি বহন করে চলেছেন।
মায়া সভ্যতা প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াও হাজার বছর আগে মানুষ কতটা উন্নত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছিল। রহস্যে ঘেরা এই সভ্যতা আজও গবেষকদের জন্য এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
