বিশ্বজুড়ে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ (IVF) ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়- এটি ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে আইভিএফ নিয়ে নীতিমালা ও শরিয়াহভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আইভিএফ (IVF) কী?
আইভিএফ বা In-Vitro Fertilization হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে নারীর ডিম্বাণু ও পুরুষের শুক্রাণু শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে নিষিক্ত করা হয়। পরে নিষিক্ত ভ্রূণ নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গর্ভধারণ সম্ভব না হলে অনেকেই এই পদ্ধতিতে সন্তান নিচ্ছেন।
আইভিএফ যেভাবে করা হয়
আইভিএফ পদ্ধতিতে সন্তান জন্মদানের ধাপগুলো হলো-
১. নারীর ডিম্বাশয় হরমোনের মাধ্যমে উদ্দীপিত করা হয়।
২. পরিপক্ক ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।
৩. পুরুষের শুক্রাণুর সঙ্গে ল্যাবে ডিম্বানু নিষিক্ত করা হয়।
৪. ২–৩ দিন পর ভ্রূণ তৈরি হলে তা জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
৫. পুরো প্রক্রিয়া সফল হলে গর্ভধারণ ঘটে।
চিকিৎসকদের মতে, সন্তান জন্মদানে অন্যান্য পদ্ধতি ব্যর্থ হলে আইভিএফ একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
মুসলিম দেশগুলোতে আইভিএফের প্রয়োগ
আপত্তি ও সমর্থনের বিপরীতমুখী মতামতের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আইভিএফ নিয়ে আইন ও নীতিমালা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইভিএফ কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন নিয়ে পার্লামেন্টেও তীব্র বিতর্ক হয়েছে।
শুরুতে ইসলামী দেশগুলোতে এই পদ্ধতিকে বেশ স্পর্শকাতর হিসেবে দেখা হলেও এখন তা অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু মুসলিম দেশে অবিবাহিত নারীদের জন্যও নির্দিষ্ট শর্তে ডিম্বাণু সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
ইসলামে আইভিএফ জায়েজ?
ইসলামী চিন্তাবিদরা কঠোর শর্তসাপেক্ষে আইভিএফে সন্তান জন্মদানকে বৈধ হিসেবে মত দিয়েছেন।
তাদের মতে, ইসলামে আইভিএফে সন্তান জন্মদান বৈধ হওয়ার মূল শর্তগুলো হলো-
১. স্বামী-স্ত্রীর ডিম্বাণু ও শুক্রাণু ব্যবহার করতে হবে।
২. ভ্রূণ স্ত্রীর জরায়ুতেই স্থাপন করতে হবে।
৩. বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায়ই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
৪. ভ্রূণ সংরক্ষণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দম্পতির বাইরের অন্য কারোর কোন উপাদানের মিশ্রণ না ঘটে।
৫. পুরো প্রক্রিয়ায় কোন তৃতীয় পক্ষ (ডোনার, সারোগেসি) সম্পূর্ণ হারাম।
তবে অতি প্রয়োজন ছাড়া এ পদ্ধতি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করেছেন ইসলামী পন্ডিতরা। কারণ, এতে অপব্যবহার বা ভুলের আশঙ্কা থাকতে পারে।
মিশরের বিখ্যাত আলেম শাইখ গাদ আল-হক এর ফতোয়া অনুযায়ী- আইভিএফ (IVF) তখনই জায়েজ হবে, যদি- স্বামীর শুক্রাণু ও স্ত্রীর ডিম্বাণু ব্যবহার করা হয় এবং ভ্রুণ স্ত্রীর জরায়ুতেই প্রতিস্থাপন করা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি বলছে, অন্য কারো ডিম্বানু বা শুক্রানু মিলে গেলে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর ডিম্বাণু ও শুক্রাণু থেকে তৈরি ভ্রুণ অন্য নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করলে- সেগুলো ইসলামে হারাম বলে বিবেচিত হবে।
সেজন্য আলেমরা এ পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছেন। যাতে করে অন্য কারো ডিম্বাণু বা শুক্রাণু মিশে না যায়।
ফতোয়া অনুযায়ী- স্বামী-স্ত্রীর কেউ ডিম্বাণু বা শুক্রাণু উৎপাদনে অক্ষম হলে অন্য কারো ডিম্বাণু কিংবা শুক্রাণু নিয়ে সন্তান জন্মদান হারাম বলে বিবেচিত হবে। সেজন্য পুরো প্রক্রিয়াটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
কারণ, ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া সন্তান জন্মদানকে বৈধতা দেয় না।
আইভিএফ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যা অনেক দম্পতির জন্য সন্তান লাভের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ইসলামে এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়, যেখানে চিকিৎসা এবং শরিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
