জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা হলে ‘শূন্য সংযম’ নীতি নেবে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় আবারও হামলা হলে ‘কোনো সংযম’ দেখানো হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

একই সঙ্গে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের সরবরাহ, দাম এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলায় তেহরান তার সামরিক সক্ষমতার ‘সামান্য অংশ’ ব্যবহার করেছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনাকে আবার লক্ষ্যবস্তু করা হলে দেশটি ‘শূন্য সংযম’ নীতি নেবে।

ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির রপ্তানি সক্ষমতা আনুমানিক ১৭ শতাংশ কমে যেতে পারে। এতে ইউরোপ, এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক অ্যান-সোফি কর্বো আল জাজিরাকে বলেন, রাস লাফান বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র। সেখানে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

তবে অতীতের অনুরূপ ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, এই স্থাপনা পুরোপুরি সচল হতে কয়েক মাস, এমনকি আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিপোর্ট এলএনজি স্থাপনাটি ২০২২ সালের দুর্ঘটনার পর আট মাস বন্ধ ছিল।

নরওয়ের স্নোহভিট প্রকল্প ২০২০ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় দেড় বছর উৎপাদনের বাইরে ছিল।

তাঁর আশঙ্কা, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রাস লাফান ২০২৬ সালের মধ্যেও পুরোপুরি চালু নাও হতে পারে। এতে বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহ পাঁচ বছর পিছিয়ে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক গ্যাসবাজারে এর প্রভাব হবে ব্যাপক।

এদিকে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে আরও দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

একই সময়ে উত্তর ইসরাইলে প্রতিহত করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো পড়ে সড়ক ও গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির ভিডিওও প্রকাশিত হয়েছে।

তেহরানে আল জাজিরার প্রতিবেদক আলি হাশেম জানিয়েছেন, পারস্য নববর্ষের আগের রাতেও ইরানের রাজধানীজুড়ে বিমান হামলা অব্যাহত ছিল।

রাজধানীর পূর্বাঞ্চল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অন্তত কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এর একটি পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে আঘাত হেনেছে বলে জানানো হয়েছে।

একই সময় ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও সশস্ত্র বাহিনী একাধিক দফায় ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথাও বলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধক্ষেত্রে আরও শক্তি জড়ো করছে বলে খবরে বলা হয়েছে।

নিউজম্যাক্সের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ৪ হাজার মেরিন ও নৌসেনা সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ২ হাজার ৫০০ মেরিন এবং ইউএসএস ট্রিপোলি পাঠানো হয়েছিল।

জ্বালানি বাজারে অস্থিরতাও বেড়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত চললে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৮০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ব্রেন্ট ক্রুডের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে; বৃহস্পতিবার তা সাময়িকভাবে ১১৯ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়।

রিয়াদের কিং ফয়সাল সেন্টারের গবেষক উমের করিমের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম ১৫০ ডলারের ওপরে ওঠাও অসম্ভব নয়।

বিশেষ করে লোহিত সাগরঘেঁষা টার্মিনালগুলোও যদি হামলার মুখে পড়ে, তাহলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট আরও ঝুঁকিতে পড়বে।

এই উত্তেজনার মধ্যে বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন, সার উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার খরচও বেড়ে যায়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এই যুদ্ধ শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক খাদ্যবাজারেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।