হাজারো প্রাণহানি আর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ২ সপ্তাহের জন্য যুদ্ধ থেকে সরে এসে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
এর সঙ্গে ওঠতে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দেয়া হরমুজ প্রণালীর ইরানি অবরোধ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর বোমা হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এর আগে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, তেহরান তার শর্ত না মানলে ‘এক রাতেই পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, হামলা থেকে সরে এসে তিনি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন।
এই ঘোষণার পরপরই বিধ্বস্ত তেহরানের রাস্তায় নেমে আসেন হাজারো ইরানি। বিজয় মিছিলে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনও যুদ্ধে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করেছে।
হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার শর্ত
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালী। সামুদ্রিক এই পথ ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস বিভিন্ন দেশে যায়, যা বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানির চাহিদা মেটায়।
ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তেহরান। ফলে অস্থির হয়ে পড়ে বাজার, বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট শুরু হয়।
এরপর থেকেই হরমুজ প্রণালী চালু করতে মরিয়া চেষ্টায় নামেন ট্রাম্প।
যুদ্ধবিরতি শর্ত হিসেবে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে অবশ্যই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক এবং নিরাপদভাবে জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে হবে।
তিনি জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান অসিম মুনীরের সঙ্গে আলোচনার পর যুদ্ধবিরতির এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান শেষ মুহূর্তে মধ্যস্থতা করে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইরান
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির মুখে শুরুতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিল তেহরান।
তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়েছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে।
“ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হলে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে।”
তেহরান বলছে, আগামী দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপদভাবে পরিচালিত হবে।
ইরান যুদ্ধে হাজারো প্রাণহানি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর বহু ক্ষয়ক্ষতির এই যুদ্ধ শুরু হয়।
এখন পর্যন্ত ইরানে ২,০৭৬ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনা নিহত এবং ইসরায়েলে ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
হামলা-পাল্টা হামলায় শহরে শহরে ধ্বংস হয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের মত স্পর্শকাতর জায়গা।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব
যুদ্ধ শুরুর পরই ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়।
ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়।
যুদ্ধবিরতির পর কোনদিকে যাচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র?
যুদ্ধবিরতির পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই দুই সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চালাবে।
ইতোমধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার কথা রয়েছে।
