ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার শুরুতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল।
বহু বছর ধরে যার পিছনে ইসরায়েলি নজরদারি চলছিল, এবার তাকে অনেকটাই সহজ শিকারে পরিণত করতে পেরেছে পশ্চিমারা।
২০ বছরের বেশি সময়ের গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণের পর মূলত কয়েক মিনিটের অভিযানেই খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত করে ফেলে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।
নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সমন্বয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
গোপন বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েই মৃত্যু
২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটের একটি কমপ্লেক্সে পৌঁছান ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
এর আগে ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় তিনি বেশিরভাগ সময়ই মাটির নীচের বাঙ্কারে অবস্থান করছিলেন।
সেদিন সকালে তেহরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে সেখানে যান খামেনি।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা।
আকাশ থেকে আসে ‘ব্লু স্প্যারো’
পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, খামেনিকে লক্ষ্য করে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয় সেটি ছিল ইসরায়েলের তৈরি ‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্র।
এটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর ক্ষেপণাস্ত্রটি দ্রুত উপরের দিকে উঠে প্রায় মহাকাশের কিনারা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, এরপর আবার পৃথিবীর দিকে নেমে এসে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
এই বিশেষ গতিপথের কারণে এটিকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আটকানো অত্যন্ত কঠিন।
ক্ষেপণাস্ত্রটি তেহরানের সেই কমপ্লেক্সে আঘাত হানে, যেখানে খামেনি ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করছিলেন। হামলায় খামেনিসহ বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন।
খামেনির পিছনে ২ দশকের নজরদারি
ইসরায়েলের সিগন্যাল গোয়েন্দা ইউনিট (Unit 8200) দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে খামেনির নিরাপত্তা কাঠামোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আসছিল।
গোয়েন্দারা তেহরানের নিরাপত্তা রক্ষীদের সময়সূচি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কমপ্লেক্সের আশপাশের ট্রাফিক ক্যামেরা- এসবের তথ্য সংগ্রহ করে খামেনির চলাচল ও বৈঠকের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা তৈরি করেছিল।
হামলার আগে কৌশলী প্রতারণা
হামলার আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী একটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল ব্যবহার করে।
ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা হয় যাতে মনে হয়, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সাপ্তাহিক ছুটির জন্য সদর দপ্তর ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন।
এর ফলে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সতর্কতা কিছুটা কমে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খামেনিকে লক্ষ্য করে যেভাবে হামলা করা হয়
তেল আবিবের সামরিক সূত্রগুলো বলছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ভোরের দিকে ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে।
পরে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে তেহরানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
এসময় খামেনির অবস্থান লক্ষ্য করে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বৈঠক চলা ভবনে আঘাত করে, অন্যগুলো আশপাশের ভবনের নিক্ষেপ করা হয়।
অপারেশন এপিক ফিউরি
এই হামলাটি Operation Epic Fury নামে একটি যৌথ ইসরায়েলি-মার্কিন অভিযানের অংশ ছিল।
এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল- ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করা এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো ভেঙে দেওয়া।
এতে তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারলেও ইরানে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারেনি পশ্চিমারা।
বিকল্প নেতৃত্ব ইসরায়েল ও মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
