যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও গাজায় ঈদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উত্তর গাজার একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছে তাজা কা’ক ও মামুলের সুগন্ধ। ৬০ বছর বয়সী সামিরা তৌমান তাঁর মেয়েদের সঙ্গে ব্যস্ত ঈদের জন্য ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরিতে।

যুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম ঈদকে ঘিরে সীমাহীন কষ্টের মাঝেও তাঁরা চেষ্টা করছেন আনন্দ ফিরিয়ে আনতে।

রোজার শেষ দিনগুলোতে সামিরা ও তাঁর পরিবার ময়দা মাখা, খেজুরের পুর ভরা, আর একের পর এক বিস্কুট বানানোর কাজে ডুবে আছেন। গ্যাসের অভাবে কাঠের চুলায় আগুন জ্বালিয়ে সেগুলো বেক করা হচ্ছে-যা এখন তাঁদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ।

সামিরা তৌমান বলেন, ‘এটা ঈদের মৌসুম, আশীর্বাদের সময়। আগের মতো আর বড় করে উদযাপন করতে পারছি না, কিন্তু তবুও চেষ্টা করছি।

শুধু নিজেদের জন্য নয়, আশপাশের মানুষদের অর্ডারও নিচ্ছেন তিনি। এতে ঈদের আগে কিছু অতিরিক্ত আয় হচ্ছে। ‘দাম অনেক বেড়েছে, তবুও মানুষ ঈদের স্বাদ ফিরে পেতে চায় বলে জানন তিনি।

সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গাজার সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ময়দা, সুজি, খেজুর, ঘি ও চিনিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। যদিও পরে আংশিকভাবে সীমান্ত খোলা হয়েছে, দাম এখনো অনেক বেশি।

সামিরা বলেন, ‘গাজায় কখনোই আনন্দ পূর্ণ হয় না। কিছু না কিছু সবসময়ই তা নষ্ট করে দেয়।’

যুদ্ধের আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছোট ব্যবসা চালাতেন। প্রতিদিন অর্ডার পেতেন, সংসারও ভালো চলত। কিন্তু যুদ্ধ সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।

তিনি বলেন, আমার দুইটা রান্নাঘর ছিল, সব আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল। এখন সবই শুধু স্মৃতি। আবার শূন্য থেকে শুরু করছি, সবকিছু হাত দিয়ে করতে হচ্ছে।

গ্যাস না থাকায় তাঁদের ছেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি থেকে ভাঙা আসবাব সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। ‘এখন রান্না মানেই ধোঁয়া আর আগুন’ বলেন সামিরা।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধের কারণে গাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে জীবনযাপন করছে। খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি এবং উচ্চমূল্য তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। সীমান্ত বন্ধ থাকায় বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার এখন দ্বিধায়-ঈদের ঐতিহ্য ধরে রাখবে, নাকি দৈনন্দিন খরচ সামলাবে।

সামিরা ও তাঁর পরিবারও এই বাস্তবতার শিকার। তারা একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং অবশেষে খান ইউনিস থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরে পেয়েছে ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তা।

সামিরা বলেন, ‘নিজের ঘরে ফেরা ভালো লাগে, কিন্তু যখন চারপাশ ধ্বংসস্তূপ আর কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই, তখন সেটা আর সুখের হয় না।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যুদ্ধবিরতির পরও পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। মাঝেমধ্যে হামলা চলছে, আর সীমান্ত দিয়ে পণ্য প্রবেশও অনিশ্চিত।

সব কষ্টের মাঝেও ঈদকে ঘিরে কিছুটা আশার আলো দেখছেন সামিরা।

একটি ক্লান্ত হাসি দিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘এই কঠিন সময় অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে।’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা